আইফেল টাওয়ার : লজ্জা থেকে অহঙ্কারের ১২৫ বছর
যাযাদি ডেস্ক 
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত আইফেল টাওয়ারকে কি ধাতব কবিতা বলা যায়? না বলে উপায়ই বা কি? অথচ ধাতুর এই খাঁচা তৈরির সময় তার কদরই বোঝেনি প্যারিসের মানুষ। অথচ আজ আইফেল টাওয়ার প্যারিস শহরের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে গোটা বিশ্বে পরিচিত। এই টাওয়ারটিই বৃহস্পতিবার অহঙ্কারের ১২৫ বছর পূর্ণ করল। ১৮৮৭ সালের ২৬ জানুয়ারি আইফেল টাওয়ার চালু হয়েছিল। শহরের মানুষ তখন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, প্যারিসের সৌন্দর্যই এতে নষ্ট হয়ে গেল। বিশিষ্ট জনরা গর্জে উঠেছিলেন, 'এ যেন এক দৈত্য_ শহরের লজ্জা'। এমনকি কমিটি গড়ে রীতিমতো 'আইফেল টাওয়ার হটাও' আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সেনাবাহিনী নাৎসিদের অপব্যবহার রুখতে টাওয়ারের অংশ বিশেষ ভেঙে ফেলার কথা ভেবেছিল। তারপর হিটলার স্বয়ং আইফেল টাওয়ার ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদিও তার সেই নির্দেশ অমান্য করা হয়েছিল। এমন অবস্থা হয়েছিল ২০১০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। সেদিন বোমা হামলার আশঙ্কায় আইফেল টাওয়ার দর্শকদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো বোমা পাওয়া না যাওয়ার পরদিন আবারো তা খুলে দেয়া হয়। ফরাসি বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সে সময় শহরে বসেছিল আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আসর। এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে তুলতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই টাওয়ার। ১৮৮৭ থেকে ১৮৮৯_ দুই বছর লেগেছিল টাওয়ারটি তৈরি করতে। এত কা- করে তৈরি করে চট করে আবার তা খুলে না নিয়ে পরিকল্পনা ছিল, মেলা শেষ হওয়ার ২০ বছর পর সেটি আবার খুলে নেয়া হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর কার্যকর হয়নি। কারণ ততদিনে আইফেল টাওয়ারের খ্যাতি গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে পর্যটকরা আসতে শুরু করে এই 'আয়রন লেডি'কে দেখতে, যা ততদিনে আইফেল টাওয়ারের ডাকনাম হয়ে গেছে। আশেপাশের দোকানে বিক্রি হচ্ছে আইফেল টাওয়ারের ক্ষুদ্র সংস্করণ। কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই টাওয়ার দেখে প্রেরণা পেতে শুরু করেছেন। এই সব কা-কারখানা দেখে প্যারিসের মানুষ অবাক। অবাক স্বয়ং গুস্তাভো আইফেল-ও, যিনি এই টাওয়ারের স্থপতি। উদ্বোধনের দিন ফরাসি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার সময় তিনি ভাবতেই পারেননি যে, তার এই সৃষ্টি অমরত্বের পথে যাচ্ছে। গুস্তাভো আইফেল রেলের জন্য সেতুর নকশা প্রণয়ন করতেন এবং টাওয়ারটি নির্মাণে তিনি সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন। মনে রাখতে হবে, সেই যুগে প্রায় ৩০০ মিটার লম্বা এই টাওয়ার ছিল গোটা বিশ্বে মানুষের তৈরি সবচেয়ে উচু কোনো সৃষ্টি। ১৯৫৭ সালে একটি অ্যান্টেনা বসানোর পর উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৩২৪ মিটার। ৭ হাজার ৩০০ টন ইস্পাত দিয়ে তৈরি হয়েছে এই টাওয়ার। আর লোহার খ- ছিল ১৮ হাজার ৩৮টি। ৩০০ জন শ্রমিক এই নির্মাণ যজ্ঞে অংশ নিয়েছিল। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী ৪০ বছর ধরে পৃথিবীর উচ্চতম টাওয়ার ছিল এটি। টেলিগ্রাফ এবং রেডিও সঙ্কেত পাঠানোর কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে এই টাওয়ারকে। ১৯২১ সালে ফ্রান্সের প্রথম পাবলিক রেডিও সমপ্রচারও শুরু হয় সেখান থেকেই। এখন সূর্যাস্তের পর থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট করে আলোর সাজে সেজে ওঠে 'লা তুর দিফেল'। প্রায় ২০ হাজার বাল্বের সেই আলোর ছটা অপরূপ এক দৃশ্য উপহার দেয়। আইফেল টাওয়ারকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনার অভাব নেই। আর পর্যটকদের ঢলও কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সূত্র : ডিডাবিস্নউ নিউজ, উইকিপিডিয়া
No comments:
Post a Comment